আল-আসমাউল হুসনা ( الْأَسْتَمَاءُ الْحُسنى ) (পাঠ ৬)

সপ্তম শ্রেণি (মাধ্যমিক) - ইসলাম শিক্ষা - আকাইদ | NCTB BOOK
422

পরিচয়

আসমা শব্দটি শব্দের অর্থ নামসমূহ। আর হুসনা শব্দের অর্থ সুন্দর। আর আসমাউল হুসনা অর্থ সুন্দর নামসমূহ। আল্লাহ তায়ালা সকল গুণের অধিকারী। তিনি সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিজিকদাতা, দয়াবান, ক্ষমাশীল, শান্তিদাতা ও পরাক্রমশালী। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা ও সর্বশক্তিমান। তিনিই মালিক। পবিত্র কুরআনে এসেছে-

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ :

অর্থ: "কোনো কিছুই তার সদৃশ নয়।" (সূরা আশ্-শুরা, আয়াত ১১)

আল্লাহ তায়ালা অতুলনীয়। তার সত্তা যেমন অনাদি ও অনন্ত, তার গুণাবলিও তেমনি অনাদি ও অনন্ত। আল্লাহ তায়ালার এসব গুণ নানা শব্দে নানা উপাধিতে আখ্যায়িত করা হয়। এসব গুণের প্রত্যেকটির পৃথক পৃথক নাম রয়েছে। এ নামগুলোকেই একত্রে আসমাউল হুসনা বলা হয়। এই পাঠে আমরা আল্লাহ তায়ালার কতিপয় গুণবাচক নামের পরিচয় লাভ করব।

প্রভাব

মানবজীবনে আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নামসমূহের প্রভাব অপরিসীম। কেননা এসব গুণবাচক নাম মানবজীবনে দুদিক থেকে প্রভাব বিস্তার করে।

প্রথমত: এসব নামের দ্বারা আমরা আল্লাহ তায়ালাকে চিনতে পারি। তার ক্ষমতা ও গুণাবলির পরিচয় পাই। যেমন- রাহমান, রাহিম নাম দ্বারা আমরা বুঝতে পারি যে আল্লাহ তায়ালা দয়াবান। গাফফার নাম দ্বারা বুঝি যে মহান আল্লাহ হলেন ক্ষমাশীল। সুতরাং পাপ করে ফেললে আমরা তার নিকট ক্ষমা চাই। তিনিই পারেন সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করতে।

অন্যদিকে তিনিই হলেন জাব্বার (প্রবল), কাহ্হার (মহাপরাক্রান্ত)। এগুলো স্মরণ থাকলে আমরা কোনো পাপ কাজ করতে পারি না। কেননা আমরা বুঝতে পারি যে পাপ কাজ করলে তিনি আমাদের শাস্তি দেবেন। তাছাড়া আল্লাহ তায়ালাই রিজিকদাতা, নিয়ামতদাতা, করুণাময়। ফলে আমরা তার নিয়ামত উপভোগ করে তার শোকরিয়া আদায় করতে পারি।

দ্বিতীয়ত: আল্লাহ তায়ালার কিছু গুণবাচক নাম আমাদেরকে উত্তম গুণাবলি অর্জনে উৎসাহিত করে।
যেমন: আল্লাহ পাক দয়ালু, আমরাও সকলের প্রতি দয়া করব, তিনি ন্যায়পরায়ণ, আমরাও সকল ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণ হবো। তিনি রিজিকদাতা। আমরাও ক্ষুধার্তকে অন্ন দেবো। আল্লাহ তায়ালা পরম ধৈর্যশীল। আমরাও বিপদে-আপদে ধৈর্যধারণ করব। এভাবে আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নামসমূহ আমাদেরকে উত্তম চরিত্রবান হতে উৎসাহিত করে।

আল্লাহু হায়্যুন (الله )

হায়্যুন শব্দের অর্থ চিরঞ্জীব। যিনি চিরকাল ধরে জীবিত। আল্লাহু হায়্যুন অর্থ আল্লাহ চিরঞ্জীব। তিনি চিরকাল ধরে আছেন, থাকবেন। যখন কোনো কিছুই ছিল না, তখনও তিনি ছিলেন। আবার কিয়ামতে যখন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে, তখনও তিনিই থাকবেন। তার কোনো ক্ষয় নেই, রোগ-শোক, দুঃখ-জরা, তন্দ্রা-নিদ্রা কিছুই নেই। কোনোরূপ ধ্বংস তাকে স্পর্শও করতে পারে না। তিনি সকল ক্ষয় ও ধ্বংস থেকে মুক্ত। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ ، لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ طَ

অর্থ: "তিনিই আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব ও সর্বসত্তার ধারক। তাকে তন্দ্রা এবং নিদ্রা স্পর্শ করে না।" (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৫)

আমরা আল্লাহ তায়ালার এ গুণ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করব। সকল কাজকর্মে আমরা প্রাণবন্ত থাকব। অলসতা, নির্জীবতা পরিহার করব। ক্লান্তি, শ্রান্তি, তন্দ্রা, নিদ্রা ইত্যাদি যেন আমাদের কাজে কোনো প্রভাব না ফেলে সে চেষ্টা করব। তাহলে আমরা সফলতা লাভ করব।

আল্লাহু কায়্যুমুন ( اللَّهُ قَيُّومُ )

কায়্যুমুন শব্দের অর্থ চিরস্থায়ী, চিরবিরাজমান, চিরবিদ্যমান, সবকিছুর ধারক সত্তা। ইসলামি পরিভাষায় সৃষ্টির তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে সত্তা অনাদি ও অনন্তকালব্যাপী বিরাজমান, তিনিই কাইয়্যুম। অন্য কথায় আপন সত্তার জন্য যিনি কারো মুখাপেক্ষী নন অথচ সকল সত্তার ধারক, এরূপ সত্তাকে কাইয়্যুম বলা হয়। আল্লাহু কায়্যুমুন অর্থ আল্লাহ চিরস্থায়ী। তিনিই সবকিছুর ধারক। তিনি বিশ্ববিধাতা। তিনি সর্বত্র বিরাজমান। আসমান-জমিনের সবকিছুই তার নিয়ন্ত্রণাধীন।

আল্লাহ তায়ালা চিরবিরাজমান। তিনি সবসময় বিদ্যমান। তিনি অনাদি-অনন্ত। তিনি সবকিছু জানেন। পৃথিবীর যাবতীয় বস্তু তারই নিয়ন্ত্রণে।

তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং নিপুণভাবে পরিচালনা করেন। কিয়ামত পর্যন্ত সবকিছুর রক্ষক তিনিই। আখিরাতেও তিনিই একমাত্র নিয়ন্ত্রক। তিনি ব্যতীত আর কোনো চিরবিরাজমান সত্তা নেই।

আল্লাহু আযিযুন (اللَّهُ عَزِيرٌ )

আযিযুন শব্দের অর্থ মহাপরাক্রমশালী। আল্লাহ তায়ালাই সকল ক্ষমতার উৎস ও মালিক। তার ক্ষমতা অসীম। তার ক্ষমতার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। কেউ তার ক্ষমতার মোকাবিলা করতে পারে না। আল-কুরআনে এসেছে-

وَاللَّهُ عَزِيزٌ ذُو انْتِقَامٍ

অর্থ: "আল্লাহ পরমপরাক্রমশালী, দণ্ডদানকারী।" (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত ৪)

আল্লাহ তায়ালা অসীম ক্ষমতাধর। কেউ তাকে অপারগ করতে পারে না। তার সাথে ধোঁকা-প্রতারণা করতে পারে না। কেউ তার কৌশল বা পরিকল্পনা ব্যর্থ করতে পারে না। তিনি যা চান তা-ই হয়। তার কুদরত বা ক্ষমতার মোকাবিলা করার শক্তি কারো নেই। তিনি যাকে ইচ্ছা অপমানিত ও লাঞ্ছিত করতে পারেন। দুনিয়ার বড় বড় ক্ষমতাবানদের তিনি ক্ষুদ্র প্রাণী বা বস্তু দ্বারা ধ্বংস করে দিয়েছেন। যেমন তিনি ফেরাউনকে পানি দ্বারা, নমরুদকে মশা দ্বারা, আবরাহাকে ছোট ছোট পাখি দ্বারা ধ্বংস করে দিয়েছেন। তাকে অস্বীকারকারী কেউই তার আযাব বা শাস্তি থেকে বাঁচতে পারেনি। ভবিষ্যতেও পারবে না।

আমরা সদাসর্বদা আল্লাহ তায়ালার এসব গুণের কথা মনে রাখব, এ গুরুত্ব ও তাৎপর্য উপলব্ধি করব। তাহলে সৎকাজ করা আমাদের জন্য সহজতর হবে।

আল্লাহু খাবিরুন ( اللَّهُ خَبِيرٌ )

খাবিবুন অর্থ সম্যক অবহিত। আল্লাহু খাবিবুন অর্থ আল্লাহ তায়ালা সবকিছু সম্যক অবহিত, সবকিছু জানেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ .

অর্থ: "নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু জানেন, সকল খবর রাখেন।" (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১৩)

আল্লাহ তায়ালা সবকিছু জানেন। তিনি সকল বিষয়েই সম্যক অবহিত। কোনো কিছুই তার নিকট অজানা নয়। আমরা যা বলি বা করি সবই তিনি জানেন। এমনকি আমরা যেসব বিষয়ের কল্পনা করি, তাও তার অজানা নয়। ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বস্তু বা প্রাণীর খবরও তিনি জানেন। গভীর সমুদ্রের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণীর খবরও তার জানা। অন্ধকার রাতে কালো পাথরের উপর কালো পিপীলিকার চলাফেরাও তার অজানা নয়। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার মতো খালি চোখে যেসব প্রাণী দেখা যায় না, সে সম্পর্কেও তিনি সম্যক অবহিত। এককথায় আসমান-জমিন ও এ বিশ্বজগতের এমন কোনো জিনিস নেই যা তার জ্ঞানের বাইরে। তিনি সবকিছু জানেন।

আমরা আল্লাহ তায়ালার এ গুণের তাৎপর্য উপলব্ধি করব। সবসময় মনে রাখব যে তিনি আমাদের সব কাজকর্ম সম্পর্কে জানেন। আমাদের সব পাপপুণ্য কিছুই তাঁর অজানা নয়। আমরা অন্যায় থেকে বিরত থাকব এবং তার ভালোবাসা অর্জন করব।

আল্লাহু সাবুরুন ( اللَّهُ صَبُورٌ )

সাবুরুন শব্দের অর্থ পরমধৈর্যশীল। আল্লাহু সাবুরুন অর্থ আল্লাহ পরমধৈর্যশীল। আল্লাহ তায়ালা সবচেয়ে বড় ধৈর্যশীল। তার ধৈর্যের কোনো সীমা নেই।

আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে নানা নিয়ামত দান করেছেন। তিনিই মানুষকে রিজিক দেন, লালনপালন করেন। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় খাদ্য-পানীয় দেন। ভয়-ভীতিতে নিরাপত্তা দান করেন। আলো, বাতাস, চন্দ্র, সূর্য, পানি সবকিছু তারই দান। সুন্দর এ পৃথিবীর সবকিছুই তিনি মানুষের কল্যাণে দান করেছেন এতকিছুর পরও অনেক মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করে না। তার অবাধ্য হয়। তার ইবাদত ছেড়ে দেয়। আল্লাহ তায়ালা এসব ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করেন। তিনি মানুষকে নিয়ামত দান বন্ধ করে দেন না। অবাধ্য হলে তিনি যদি আলো বা পানি বন্ধ করে দিতেন, তাহলে সকলে ধ্বংস হয়ে যেত। অবাধ্যতার জন্য তিনি তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তিও দেন না। বরং তিনি সুযোগ দেন। মানুষ যদি তওবা করে ফিরে আসে, তবে তিনি ক্ষমা করে দেন। এরপর যদি মানুষ আবার পাপ করে তিনি পুনরায় ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা করেন। বান্দা যদি আবার তওবা করে তিনি পুনরায় ক্ষমা করেন। আল্লাহ ধৈর্যশীল ব্যক্তিকে ভালোবাসেন। তিনি সর্বদা ধৈর্যশীলদের সাথে থাকেন। আল্লাহ বলেন-

إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ .

অর্থ: "নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।" (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৫৩)

ধৈর্যশীলদেরকে আল্লাহ জান্নাত দান করবেন। মহান আল্লাহ বলেন-

وَبَشِّرِ الصَّبِرِينَ

অর্থ: "তুমি সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলগণকে।" (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৫৫)

আমরাও আল্লাহ তায়ালার এ গুণের অনুশীলন করব। অধীনদেরকে ক্ষমা করব। বিপদে-আপদে নিরাশ হবো না, বরং ধৈর্যধারণ করব।

দলগত কাজ: মানবজীবনে আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নামসমূহের প্রভাব বর্ণনা কর।
বাড়ির কাজ: আল্লাহর তায়ালার পাঁচটি গুণবাচক নাম অর্থসহ লেখ।
Content added By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...